0

প্রশ্ন: ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়াচাড়া না করে তথা মনে মনে জিকির করা হলে তা কি সহিহ হবে?

উত্তর: সাধারণভাবে নফল ইবাদত হিসেবে ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়াচাড়া না করে মনে মনে জিকির করা শরিয়ত সম্মত। এ বিষয়ে এটি অধিক নির্ভরযোগ্য অভিমত।

ঠোঁট ও জিহ্বা নেড়ে জিকির করার কিছু দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ

“আর তোমার রবের জিকির করো ভয়ভীতি ও কাকুতি-মিনতি সহকারে এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর অবহেলাকারীদের দলভূক্ত হয়ো না।”

(সূরা আরাফ: ২০৫)

বিশিষ্ট তাবেঈ মুফাসসির মুজাহিদ এ আয়াতের তাফসিরে বলেন,

أمروا أن يذكروه في الصدور تضرعًا وخيفة

“মানুষকে ভয়ভীতি ও কাকুতি-মিনতি সহকারে মনে মনে তাঁর (আল্লাহর) জিকির করতে আদেশ করা হয়েছে।”

(তাফসিরে ত্ববারি)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ، ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي ملإٍ، ذَكَرْتُهُ فِي مَلإٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ

“সুতরাং যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে; আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি।”

(সহিহ বুখারি/৭৪০৫; মুসলিম/১৬৭৫)

মনে মনে ও উচ্চারণ করে জিকির করার বিষয়ে দ্বিমতঃ

◍ মনে মনে জিকির করা না কি জিহ্বা ও ঠোঁট নেড়ে মুখে উচ্চারণ করে জিকির করা বেশি ভালো?

এ বিষয়ে পূর্বসূরিদের মাঝে দ্বিমত দেখা যায়। যেমনঃ

➧ মা আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

“لأن أذكرَ الله في نفسي أحبُّ إليَّ من أن أذكُره بلساني سبعين مرَّة”،[التوضيح لشرح الجامع الصحيح – كتاب الرقاق]

“মনে মনে আল্লাহর জিকির করা আমার কাছে জিহ্বা নেড়ে জিকির করা থেকে সত্তরগুণ বেশি উত্তম।”

[আত তাওযীহ লি শারহিল জামে-কিতাবুর রাকায়েক-ইবনুল মুলাক্কিন]

➧ পক্ষান্তরে আবু উবায়দা বিন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন,

“ما دام قلْب الرَّجُل يذكر الله تعالى فهو في صلاة، وإن كان في السُّوق، وإن تحرَّك بذلك اللِّسان والشَّفتان، فهو أعظم”.”التوضيح لشرح الجامع الصحيح لابن الملقن (29/ 542)

“মানুষ যতক্ষণ মনে মনে আল্লাহর জিকির করে ততক্ষণ সে সালাতের মধ্যেই থাকে যদিও সে বাজারে থাকে। আর যদি জিহ্বা ও দু ঠোঁট নাড়িয়ে জিকির করে তাহলে তা অধিক মর্যাদাপূর্ণ।”

[আত তাওযীহ লি শারহিল জামে-কিতাবুর রাকায়েক-ইবনুল মুলাক্কিন ২৯/৫৪২]

সমাধানঃ

ইমাম ত্ববারি তাফসিরে উপরোক্ত মতোবিরোধ উল্লেখ করার পর বলেন,

والصواب عندي أنَّ إخْفاء النَّوافل أفضل من ظهورها لِمن لم يكن إمامًا يُقتدَى به، وإن كان في محفل اجتمع أهلُه لغير ذكر الله أو في سوق؛ وذلك أنه أسلم له من الرياء. [شرح صحيح البخاري لابن بطال]

“আমার দৃষ্টিতে সঠিক কথা হল, নফল ইবাদত প্রকাশ করার চেয়ে গোপন করাই অধিক উত্তম যদি কেউ ইমাম বা অনুসরণীয় ব্যক্তি না হয় বা যদি সে এমন লোক সমাবেশে থাকে যেখানে মানুষ আল্লাহর জিকির ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছে বা বাজারে থাকে । কারণ তা রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব সৃষ্টি থেকে নিরাপদ।”

[ইবনে বাত্তাল রচিত শারহু সহিহিল বুখারি ১০/৪৩০]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন,

অন্তর ও জিহ্বা উভয়টার সমন্বয়ে যে জিকির করা হয় তা সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ। আর যা কেবল অন্তর দ্বারা করা হয় তা অপূর্ণাঙ্গ।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

أَنا مَعَ عبدي إذا هوَ ذَكَرَني وتحرَّكت بي شفتاهُ

“আমি আমার বান্দার সাথে থাকি যখন সে আমার জিকির করে এবং তার দু ঠোঁট নাড়ে।”

[সহিহ ইবনে মাজাহ, হা/৩৭৪]

এ হাদিস থেকে ইবনে তাইমিয়া রাহ. এর কথা যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়।

মোটকথা, অন্তরে জিকির করা জায়েজ। তবে যদি কেউ নির্জনে থাকে তাহলে ঠোঁট ও জিহ্বা নেড়ে জিকির করবে। কারণ তা পূর্ণাঙ্গ ও‌ অধিক উত্তম।

অনুরূপভাবে লোকজনের সামনে থাকলেও মুখে উচ্চারণ করে বা ঠোঁট ও জিহ্বা নেড়ে জিকির করা যেতে পারে লোকজনকে শেখানোর উদ্দেশ্যে – যদি সে দীনী বিষয়ে অনুসরণীয় ব্যক্তি হয়। যেমন: মসজিদের ইমাম, দীনী শিক্ষক, আলেম প্রমুখ।

যখন মনে মনে জিকির করা উত্তমঃ

কিন্তু যদি অন্তরে রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে তাহলে মনে মনে জিকির করবে। কারণ রিয়া থেকে ইবাদতকে রক্ষা করা অপরিহার্য। অন্যথায় ইবাদত বাতিল বলে গণ্য হবে। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।

আরও কিছু ব্যতিক্রমঃ

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ সালাতে কুরআন তেলাওয়াত ও অন্যান্য দুআ, তাসবিহ, দরুদ ইত্যাদি মুখে উচ্চারণ করে পাঠ করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে মনে মনে এগুলো স্মরণ করলে সালাত শুদ্ধ হবে না। কেননা হাদিসে সালাতে এই সকল কিরাআত ও দুআ, তাসবিহ ইত্যাদি ‘পাঠ করা’র কথা বলা হয়েছে। আর মুখে উচ্চারণ ছাড়া পাঠ করা সম্ভব নয়। পাঠ করতে হলে অবশ্যই জিব্বা ও ঠোঁট নাড়াতে হবে-যেন প্রতিটি অক্ষর সঠিকভাবে উচ্চারিত হয়।

আরও পড়ুনঃ ফরজ সালাত এর পর প্রচলিত মুনাজাত ও বিভিন্ন দুয়া সম্পর্কে

আল্লাহু আলাম।

উত্তর প্রদানেঃ
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।


শুক্রবারে সূরা কাহাফ পাঠ ও এর দশ আয়াত মুখস্থ করার ফযিলত

Previous article

বোরকা বিক্রয়ের জন্য তা পরে মডেলিং

Next article

You may also like