1

রমাযান মাসকে ঘিরে সমাজে একধিক বিদআত প্রচলিত রয়েছে। যেগুলো এক জায়গায় এক রকম, অন্য জায়গায় আর এক রকম। এক দেশের লোকাচার অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। নিম্নে আমরা আমাদের দেশে প্রচলিত এ সংক্রান্ত কিছু বিদআতী কাজের চিত্র তুলে ধরব।

১) নতুন চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে বিদ্‌আত:

রামাযানের নতুন চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু লোক চাঁদের দিকে হাত উঁচু করে শাহাদাত আঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করে থাকে। এটা বিদআত। কেননা, কুরআন-সুন্নাহতে এর কোন ভিত্তি নাই।

তবে নতুন চাঁদ দেখলে নিম্নোক্ত দুআটি পাঠ করা সুন্নাত:

اللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْيُمْنِ وَالإِيمَانِ وَالسَّلاَمَةِ وَالإِسْلاَمِ رَبِّى وَرَبُّكَ اللَّهُ

আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমানি ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম। রাব্বী ওয়া রাব্বুকাল্লাহ”।

অর্থ: হে আল্লাহ, এ চাঁদকে আমাদের মাঝে বরকত, ঈমান, শান্তি-নিরাপত্তা ও ইসলামের সাতে উদিত কর। আমার ও তোমার রব আল্লাহ।”

মুসনাদ আহমাদ, তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণিত (৩/৪২০), তিরমিযী, অনুচ্ছেদ: চাঁদ দেখার সময় কী বলবে? আল্লামা আলবানী (রাহ:) বলেন: হাদীসটি সহীহ।

২) সেহরী সংক্রান্ত বিদআত:

দেখা যায়, রামাযান মাসে শেষ রাতে মুআযযিনগণ মাইকে উচ্চ আওয়াযে কুরআন তেলাওয়াত, গযল, ইসলামী সঙ্গীত ইত্যাদি গাওয়া শুরু করে। অথবা টেপ রেকর্ডার চালিয়ে বক্তাদের ওয়াজ, গজল বাজাতে থাকে। সেই সাথে চলতে থাকে ভায়েরা আমার, বনেরা আমার, উঠুন, সাহরীর সময় হয়েছে, রান্না-বান্না করুন, খাওয়া-দাওয়া করুন” ইত্যাদি বলে অনবরত ডাকাডাকি। অথবা কোথাওবা কিছুক্ষণ পরপর উঁচু আওয়াজে হুইশেল বাজানো হয়।

এর থেকে আরো আজব কিছু আচরণ দেখা যায়। যেমন, এলাকার কিছু যুবক রামাযানের শেষ রাতে মাইক নিয়ে এসে সম্মিলিত কন্ঠে গযল বা কাওয়ালী গেয়ে মানুষের বাড়ির দুআরে দুআরে গিয়ে চাঁদা আদায় করে। অথবা মাইক বাজিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। এ ছাড়াও এলাকা ভেদে বিভিন্ন বেদআতী কার্যক্রম দেখা যায়।

আমাদের জানা উচিত, শেষ রাতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিচের আসমানে নেমে আসেন। এটা দুআ কবুলের সময়। আল্লাহ তাআলার নিকট এ সময় কেউ দুআ করলে তিনি তা কবুল করেন। মুমিন বান্দাগণ এ সময় তাহাজ্জুদের নামায পড়েন, কুরআন তেলাওয়াত করেন, মহান আল্লাহ তাআলা তায়ালা দরবারে রোনাযারী করে থাকেন। সুতরাং এ সময় মাইক বাজিয়ে, গযল গেয়ে বা চাঁদা তুলে এ মূল্যবান সময়ে ইবাদতে বিঘ্নিত করা নিঃসন্দেহে গুনাহর কাজ। এতে মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো হয়।

যার ফলে অনেকের সেহরী এমনকি ফজরের নামায পর্যন্ত ছুটে যায়। এই কারণে অনেক রোযাদারগণ সেহরীর শেষ সময় পর্যন্ত বিলম্ব না করে আগে ভাগে সেহরী শেষ করে দেয়। এ সবগুলোই গুনাহের কাজ।

তাহলে আমাদেরকে জানতে হবে ক্ষেত্রে সুন্নত কী?

এ ক্ষেত্রে সুন্নাত হচ্ছে, ফজরের আগে সেহরীর জন্য আলাদা একটি আযান দেয়া। এই আযান হল সেহরী খাওয়ার জন্য এবং তারপর ফজর সালাতের জন্য আরেকটি আযান দেয়া। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে দুজন মুআযযিনও নিয়োগ করা ছিল। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

« إِنَّ بِلاَلاً يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ ، فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يُؤَذِّنَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ »

“বেলাল রাতে আযান দেয়। অত:এব তোমরা বেলালের আযান শুনলে পানাহার করতে থাক ইবনে উম্মে মাকতুমের আযান দেয়া পর্যন্ত।”

বুখারী, অনুচ্ছেদ: ফজরের আগে আযান দেয়া। মুসলিম: অনুচ্ছেদ: ফজর উদিত হলে রোযা শুর হবে……।

সুনানুন নাসাঈর হাদীসে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

إِنَّ بِلَالًا يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ لِيُوقِظَ نَائِمَكُمْ وَلِيَرْجِعَ قَائِمَكُمْ وَلَيْسَ أَنْ يَقُولَ هَكَذَا يَعْنِي فِي الصُّبْحِ

“বেলাল আযান দেয় এজন্য যে, যেন ঘুমন্ত লোক জাগ্রত হয় আর তাহাজ্জুদ আদায়কারী ফিরে আসে অর্থাৎ নামায বাদ দেয় এবং সেহরী খায়।”

সুতরাং এ দুটির বেশি কিছু করতে যাওয়া বিদআত ছাড়া অন্য কিছু নয়। এজন্যই ওলামাগণ বলেছেন: “যেখানে একটি সুন্নত উঠে যায় সেখানে একটি বিদআত স্থান করে নেয়।” আমাদের অবস্থাও হয়েছে তাই। সুন্নত উঠে গিয়ে সেখানে নিজেদের মনগড়া পদ্ধতি স্থান দখল করে নিয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে পুনরায় সুন্নতের দিকে ফিরে আসার তাওফীক দান করুন। আমীন।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, যে এলাকায় দুটি আযান দেয়ার প্রচলন নেই সেখানে রামাযান মাসে হঠাৎ করে দুটি আযান দেয়া ঠিক নয়। কেননা, এতে মানুষের মাঝে সেহরী খাওয়া ও ফজর সালাতের সময় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

৩) সেহরী নিয়ত মুখে উচ্চারণ

সেহরী খাওয়া একটি ইবাদত। আর যে কোন ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য নিয়ত অপরিহার্য শর্ত। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

« إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ »

সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।”

সহীহ বুখারী

তাই রোযা রাখার জন্য নিয়ত থাকা অপরিহার্য। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

مَنْ لَمْ يُبَيِّتْ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ فَلَا صِيَامَ لَهُ

“যে রাতে (ফজরের আগে) রোযা রাখার নিয়ত করে নি তার রোযা হবে না।”

সুনান নাসাঈ, আল্লামা আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

সেহরি খাওয়ার পূর্বে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করার বিধান কি?

কিন্তু জানা দরকার, নিয়ত কী বা কিভাবে নিয়ত করতে হয়? নিয়ত কী বা কিভাবে নিয়ত করতে হয়?

ইমাম নববী (রাহ:) বলেন: মনের মধ্যে কোন কাজের ইচ্ছা করা বা সিদ্ধান্ত নেয়াকেই নিয়ত বলা হয়। সুতরাং রোযা রাখার কথা মনে মধ্যে সক্রিয় থাকাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট। মুখে উচচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। কেননা, ইসলামী শরীয়তে কোন ইবাদতের নিয়ত মুখ দিয়ে উচ্চারণের কথা আদৌ প্রমণিত নয়।

অথচ আশ্চর্য জনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ওযুর নিয়ত, নামাযের নিয়ত, সেহরী খাওয়ার নিয়ত ইত্যাদি চর্চা করা হয়। নামায শিক্ষা, রোযার মাসায়েল শিক্ষা ইত্যাদি বইতে এ সব নিয়ত আরবীতে অথবা বাংলা অনুবাদ করে পড়ার জন্য জনগণকে শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্ত আমাদের একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দ্বীনের মধ্যে এভাবে নতুন নতুন সংযোজনের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেন:

« مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ »

“যে আমাদের এই দ্বীনে এমন নতুন কিছু তৈরি করল যা তার অন্তর্ভূক্ত নয় তা পরিত্যাজ্য।”

বুখারী ও মুসলিম

তাই মুসলমানদের কর্তব্য হল, দলীল-প্রমাণ ছাড়া গদবাধা নিয়ত সহ সব ধরণের বিদআতী কার্যক্রম পরিত্যাগ করা এবং সুন্নতকে শক্তভাবে ধারণ করা। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

নিয়ত করা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুনঃ নিয়াত কি, কিভাবে করে, বিধান কি?

৪) বিলম্বে ইফতার করা:

কিছু রোযাদারকে দেখা যায়, স্পষ্টভাবে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও অতি সর্তকতার কারণে আরও কিছুক্ষণ পরে ইফতার করে। এটি স্পষ্ট সুন্নত বিরোধীতা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

« لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ »

মানুষ ততদিন কল্যাণে উপর থাকবে যতদিন তাড়াতাড়ি ইফতার করবে।”

বুখারী ও মুসলিম

৫) তারাবীহ নামায সংক্রান্ত বিদআত:

অনেক মসজিদে দেখা যায়, তারাবীহর নামাযের প্রতি চার রাকাত শেষে মুসল্লীগণ উঁচু আওয়াজে ‘সুবাহানা যিল মুলকে ওয়াল মালাকূতে…” দুআটি পাঠ করে থাকে। এভাবে নিয়ম করে এই দুয়া পাঠ করা বিদআত। অনুরূপভাবে এ সময় অন্য কোন দুআ এক সাথে উঁচু আওয়াজে পাঠ করাও বিদআত।

কারণ, এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস নেই। বরং নামায শেষে যে সকল দুআ সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে সেগুলো পাঠ করা সুন্নত। যেমন, তিনবার আস্‌তাগফিরুল্লাহ”, একবার আল্লাহুম্মা আন্‌তাস সালাম ওয়ামিন্‌কাস সালাম, তাবারাক্‌তা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকারাম” ইত্যাদি। এ দুয়াগুলো প্রত্যেকেই চুপিস্বরে নিজে নিজে পাঠ করার চেষ্টা করবে।

৬) তারাবীর নামাযে দ্রুত কুরআন তেলাওয়াত

অনেক মসজিদে রামাযানে তারাবীর নামাযে খুব তাড়াতাড়ি কুরআন তেলাওয়াত করা বা তাড়াহুড়া করে নামায শেষ করা। যার কারণে তেলাওয়াত ঠিক মত বুঝাও যায় না। নামাযে ঠিকমত দুআ-যিকিরও পাঠ করা যায় না। এটা নি:সন্দেহে সুন্নত পরিপন্থী। কেননা, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাতের কিয়ামুল লাইল হত অনেক দীর্ঘ এবং ধীরস্থির।

৭) বদর দিবস পালন করা বিদআত:

২য় হিজরীর রামাযনের সতের তারিখে বদরের প্রান্তরে মক্কার মুশরিক সমম্প্রদায় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার জানবাজ সাহসী সাহাবয়ে কেরামের মাঝে এক যুগান্তকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধ ছিল অস্ত্র-সম্ভার এবং জনবলে এক অসম যুদ্ধ। মুসলমানগণ অতি নগণ্য সংখ্যক জনবল আর খুব সামান্য অস্ত্র-শস্ত্র সহকারে কাফেরদের বিশাল অস্ত্র সজ্জিত বাহিনীর প্রতিরোধ করেছিলেন এবং আল্লাহ তায়ালা সে দিন অলৌকিকভাবে মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেছিলেন। এ যুদ্ধের মাধ্যমে সত্য মিথ্যার মাঝে চুড়ান্ত পার্থক্য সূচিত হয়েছিল।

এতো ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু প্রতি বছর রামাযানের সতের তারিখে এ ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্বরণ করার জন্য লোকজন একত্রিত হয়ে কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। তারপর বদরের বিভিন্ন ঘটনা, সাহবীদের সাহসীকতা ইত্যাদি আলাচনা কর হয়। এভাবে প্রতি বছর এই দিনে ‘বদর দিবস’ পালন করা হয়। এটি যদিও আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে এটির প্রচলন তেমন নেই। কিন্তু দু:খ জনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের কিছু ইসলামী সংগঠন প্রতি বছর বেশ জোরে শোরে সাংগঠনিক কার্যক্রম হিসেবে এই বিদআত পালন করে থাকে। অথচ উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার সর্বোত্তম আদর্শ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং সালাফে সালেহীন থেকে এ জাতীয় অনুষ্ঠান পালনের কোন ভিত্তি নাই। বদরের এ ঘটনা নি:সন্দেহে মুসলমানদের প্রেরণার উৎস। এ সম্পর্কে জ্ঞান অজর্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এভাবে দিবস পালন করা শরীয়ত সম্মত নয়।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহ:) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াত জীবনে রয়েছে অনেক বক্তৃতা, সন্ধি-চুক্তি এবং বিভিন্ন বড় বড় ঘটনা, যেমন, বদর, হুনাইন, খন্দক, মক্কা বিজয়, হিজরত মূহুর্ত, মদীনায় প্রবেশ, বিভিন্ন বক্তৃতা যেখানে তিনি দ্বীনের মূল ভিত্তিগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তিনি তো এ দিনগুলোকে আনন্দ-উৎসব হিসেবে পালন করা আবশ্যক করেন নি। বরং এ জাতীয় কাজ করে খৃষ্টানরা। তারা ঈসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে। অনুরূপভাবে ইহুদীরাও এমনটি করে। ঈদ-উৎসব হল শরীয়তের একটি বিধান। আল্লাহ তায়ালা শরীয়ত হিসেবে যা দিয়েছেন তা অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় এমন নতুন কিছু আবিস্কার করা যাবে না যা দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত নয়।”[28]

মূলত: এ জাতীয় কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের শরীয়ত থেকে দূরে রাখার একটি অন্যতম মাধ্যম। সুতরাং শরীয়ত যে কাজ করতে আদেশ করে নি তা হতে দূরে অবস্থান করে রামাযান মাসে অধিকহারে কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামায আদায় করা, জিকির-আযকার এবং অন্যান্য এবাদত-বন্দেগী বেশি বেশি করা দরকার। কিন্তু মুসলমানদের অন্যতম সমস্যা হল শরীয়ত অনুমোদিত ইবাদত বাদ দিয়ে নব আবিস্কৃত বিদআতী আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকা। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন।

৮) ইতিকাফ সংক্রান্ত ভুল ধারণা:

আমাদের দেশে মনে করা হয় যে, সমাজের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই ইতিকাফে বসতে হবে তা না হলে সবাই গুনাহগার হবে। কিন্তু এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। কারণ, ইতিকাফ হল একটি সুন্নত ইবাদাত। যে কোন মুসলমানই তা পালন করতে পারে। যে ব্যক্তি তা পালন করবে সে অগণিত সোওয়াবের অধিকারী হবে। সবার পক্ষ থেকে একজনকে ইতিকাফে বসতেই হবে এমন কোন কথা শরীয়তে নেই।

৯) জুমুআতুল বিদা পালনের বিদআত:

আমাদের দেশে দেখা যায়, রামাযানের শেষ শুক্রবারে জুমুআতুল বিদা পালন করা হয়। এ উপলক্ষ্যে জুমুআর নামাযে প্রচুর ভিড় পরিলক্ষীত হয়। অথচ কুরআন সুন্নায় এ ব্যাপারে কোন ধারণা পাওয়া যায় না। আমাদের কর্তব্য প্রত্যেক জুমুআকে গুরুত্ব দেয়া। শেষ জুমুআর বিশেষ কোন ফযীলত আছে বলে কোন প্রমাণ নাই।

১০) ফিতরা প্রদানের ক্ষেত্রে সুন্নাতের বরখেলাপ:

খাদ্য দ্রব্য না দিয়ে টাকা দিয়ে অথবা কাপড় কিনে ফিতরা দেয়া সুন্নতের বরখেলাপ। কারণ, হাদীসে ফিতরা হিসেবে খাদ্য দ্রব্য প্রদান করার কথাই বর্ণিত হয়েছে । যেমন ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:

فَرَضَ رَسُولَ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ ، عَلَى كُلِّ حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ ، ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى ، مِنَ الْمُسْلِمِينَ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের প্রত্যেক স্বাধীন, দাস, পুরুষ অথবা নারী সকলের উপর এক সা (প্রায় আড়াই কেজি) পরিমান খেজুর অথবা জব যাকাতুল ফিতর হিসেবে আবশ্যক করেছেন।”

(বুখারী ও মুসলিম) এখানে খাদ্য দ্রব্যের কথা সুস্পষ্ট।

তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও দিনার-দিরহামের প্রচলন ছিল কিন্তু তিনি অথবা তার কোন সাহাবী দিনার-দিরহাম দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন বলে কোন প্রমাণ নাই। তাই সুন্নত হল, আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য দ্রব্য (যেমন চাউল) দ্বারা ফিতরা আদায় করা।

আরেকটি বিষয় হল: হাদীসে বর্ণিত এক সা’র পরিবর্তে আধা সা ফিতরা দেওয়াও সুন্নতের বরখেলাপ। যেমনটি উপরোক্ত হাদীসে স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও আমাদের সমাজে আধা সা ফিতরা দেয়ার মাসআলাই দেয়া হয়।

আল্লাহ তাআলা সকল ক্ষেত্রে তার নবীর সুন্নতকে যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন এবং সকল বিদআত ও সুন্নত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

সংকলনেঃ
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা


রমাযান বিষয়ক কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

Previous article

রমাযানে কুরআন বিষয়ে যেদিকে গুরুত্ব দিবো

Next article

You may also like

লেখাটি আরও যে পোষ্টে উল্লেখ করা হয়েছেঃ